
প্রতিবেদক,
মহালয়ার মধ্য দিয়ে সূচনা হয়েছিল দেবীপক্ষের, বেজেছিল মা দুর্গার আগমনীবার্তা। এবার বোধন তথা দেবীর নিদ্রাভঙ্গের আবাহনের পর আমন্ত্রণ ও মহাষষ্ঠীর অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুরু হচ্ছে এ বছরের শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা।
আজ শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গাকে মর্ত্যে আহ্বান জানানোর মধ্য দিয়ে শুরু হচ্ছে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা। মর্ত্যে এসে দেবী দুর্গা অসুর বধের পর ফিরে যাবেন কৈলাসে, বিজয়া দশমীতে ভক্তদের কাছ থেকে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে।
আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠ দিনে মহাষষ্ঠীর আনুষ্ঠানিকতায় শুরু হয়ে দশম দিনে বিজয়া দশমী পর্যন্ত পাঁচ দিনব্যাপী পালন করা হয়ে থাকে দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা। তবে বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা বলছে, তবে এবার মহাসপ্তমী তিথি বিস্তৃত হয়েছে শনি ও রোববার তথা দুই দিনব্যাপী। সে মতে অষ্টমী, নবমী ও দশমীর তিথিও পিছিয়ে গেছে। তাতে বুধবার পড়েছে দশমী। অর্থাৎ দুর্গাপূজার উৎসব এবার চলবে ছয়দিন।
সনাতন শাস্ত্র মতে, এবার দেবী দুর্গার আগমন ঘটবে ঘোটকে (ঘোড়ায়) এবং মর্ত্য ভ্রমণ শেষে দেবী কৈলাসে গমন করবেন নৌকায়। দেবীর ঘোড়ায় আগমন ছত্রভঙ্গ বা অস্থিতিশীলতা ও যুদ্ধের আশঙ্কার ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে নৌকায় গমনকে শুভ বলে মনে করা হয়, যা সাধারণত বন্যা বা শস্যবৃদ্ধির ইঙ্গিত। সে হিসাবে এবার দেবীর আগমন ও প্রস্থান সহিংসতা ও সমৃদ্ধির যৌথ বার্তা দিচ্ছে।
এ বছর ঘোড়ায় চড়ে মর্ত্যে আসছেন দেবী দুর্গা, ফিরবেন নৌকায় চড়ে।
সনাতন বিশ্বাস অনুযায়ী, দুর্গা দেবীর মর্ত্যে আগমনের প্রকৃত সময় চৈত্র মাস, অর্থাৎ বসন্ত কাল। কিন্তু ত্রেতাযুগে ভগবান রাম তার স্ত্রী সীতাকে উদ্ধার করতে আশ্বিন মাস তথা শরৎকালে দেবী দুর্গার বোধন করেন। তাতে সাড়া দিয়ে ব্রহ্মার নির্দেশে দেবী দুর্গা মর্ত্যে হাজির হয়ে রাবণকে বধ করেন, রাম উদ্ধার করেন সীতাকে। রাবণ তথা অসুরের বিরুদ্ধে দেবী দুর্গার এ বিজয়কে অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির জয়ের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বসন্তের পরিবর্তে শরতে দেবীর বোধনের কারণেই একে অকালবোধন বলা হয়। আর রামের আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেবী দুর্গার শরতে মর্ত্যে আগমনের কারণেই একে বলা হয় শারদীয় দুর্গোৎসব। এ ছাড়া চৈত্র মাসেও দুর্গাপূজা হয়, যাকে বলা হয় বাসন্তী পূজা। বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে শারদীয় দুর্গাপূজাই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব।
শারদীয় দুর্গোৎসবে মহাষষ্ঠীতে ষোড়শ উপচারে দেবী দুর্গাকে মর্ত্যে আহ্বান জানানো হবে, যার সূচনা ঘটবে ষষ্ঠ্যাদি কল্পারম্ভ ও বিহিত পূজার মাধ্যমে। সপ্তমীতে নবপত্রিকা প্রবেশ ও স্থাপনের পর হবে মহাসপ্তমীর পূজা। মহাঅষ্টমীতে সন্ধিপূজা ও মহানবমীতে রয়েছে বিহিত পূজা। সবশেষে দশমীতে দর্পণ বিসর্জনের পর প্রতিমা বিসর্জন।
এ বছর সারা দেশে মোট ৩৩ হাজার ৮৫১টি পূজা আয়োজন করা হয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে দেড় হাজারটি বেশি। তবে ঢাকা শহরে গত বছর ২৬১টি পূজা হয়েছিল, এবার হচ্ছে ২৫৮টি। এরই মধ্যে পূজার সব প্রস্তুতি শেষ হয়েছে মণ্ডপে মণ্ডপে। এবার মূল আনুষ্ঠানিকতার অপেক্ষা।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এবার নির্বাহী আদেশে দুর্গাপূজার ছুটি তিন দিন করেছে সরকার। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শুক্র ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটি। সব মিলিয়ে ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত টানা পাঁচ দিন থাকছে সরকারি ছুটি।
এবার পূজামণ্ডপের সরকারি অনুদানও চার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে পাঁচ কোটি টাকা করা হয়েছে। পূজামণ্ডপে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। প্রতিটি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তার দায়িত্ব বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও নানা প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে।
নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদ্যাপনে আয়োজক ও দর্শনার্থীদের জন্য বাংলাদেশ পুলিশ জরুরি দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ দিয়েছে। পুলিশ সদরদপ্তরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত কোনো খবরের সত্যতা যাচাই না করে তাতে লাইক, কমেন্ট বা শেয়ার করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
‘দুর্গাপূজায় সারা দেশে প্রায় ১০ হাজার বিজিবি সদস্য মোতায়েন থাকবে’BGB
পূজামণ্ডপের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি মণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা ও অগ্নিনির্বাপণযন্ত্র স্থাপনের পরামর্শও দিয়েছে পুলিশ। প্রতিমা বিসর্জনের সময় নির্ধারিত পথ অনুসরণের পাশাপাশি মণ্ডপের নিরাপত্তায় নিয়োজিত স্বেচ্ছাসেবকদের জন্য আলাদা পোশাক, দৃশ্যমান পরিচয়পত্র ও ‘স্বেচ্ছাসেবক’ লেখা আর্মব্যান্ড নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে আয়োজকদের।